বুধবার , ডিসেম্বর ২ ২০২০
   বুধবার|১৭ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ|২রা ডিসেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ
    ১৬ই রবিউস সানি, ১৪৪২ হিজরি
Breaking News

ত্রিশাল টু ময়মনসিংহ- ময়মনসিংহ প্রেস ক্লাবের আদ্যোপান্ত

জাহাঙ্গীর আলম: নিকষ কালো অন্ধকার, ঘন কুয়াশার চাঁদরে ঢাকা রাজপথ। জনমানুষের চিহ্ন নেই, গাড়ি-ঘোড়াও কম। ডিসেম্বরের এক শীতার্ত রাত, প্রায় আটাশ বছর আগের কথা। ত্রিশাল থেকে মোটরবাইকে ময়মনসিংহ ফিরছি আমরা দুই সাংবাদিক। হেলাল বাইক চালাচ্ছে, আমি পিছনে বসা। ত্রিশাল থেকে রওনা করেছি রাত আটটার দিকে। চুরখাই বাজার ছেড়েছি বেশ আগে, দিঘারকান্দা’র কাছাকাছি আসতেই হেলাল বলতে শুরু করলো, ‘জাহাঙ্গীর ভাই, এখন যদি ডাকাত ধরে তাহলে উপায় নাই।’ হেলালের মুখের কথা শেষ হতে না হতেই টর্চের তির্যক আলো এসে পড়লো আমাদের চোখে মুখে। ঘন কুয়াশার কারণে এমনিতেই বাইকের গতি কম, তার ওপর হঠাৎ টর্চের তীর্যক আলো, হেলাল বাইক থামানোর চেষ্টা করলো। কিন্তু এর আগেই ওর হাতে ভারী কিছুর আঘাত পড়লো। হেলাল টাল সামলাতে না পেরে বাইকসহ রাস্তায় পড়ে গেলো। আমি ছিটকে পড়লাম রাস্তার পশ্চিম পাশে, প্রায় খাদে পড়ার উপক্রম। সম্বিত ফিরে দেখি মুখে গামছা বাঁধা জনাতিনেক অল্প বয়সী ছেলে, আমাকে ধরে একরকম টেনেহিচড়ে রাস্তার পূর্ব পাশে নিয়ে গেল। একই কায়দায় অন্য কয়েকজন হেলালকেও নিয়ে গেল রাস্তার পূর্ব পাশে, আমার কাছ থেকে ১৫/২০ গজ দূরে ।   

পাঠক নিশ্চয় বুঝেতে পারছেন এটি কোনো নাটকের দৃশ্য নয়, একটি শ্বাসরুদ্ধকর হাইওয়ে ডাকাতির বাস্তব চিত্র। আজ থেকে প্রায় ২৮ বছর আগের কথা, ১৯৯২ সালের ডিসেম্বরের কোনো এক শীতের রাতে ত্রিশাল থেকে ময়মনসিংহ আসার পথে একদল ডাকাতের কবলে পড়ি আমরা দুই সাংবাদিক।   আবু দারদার ফরমায়েশ বৈশ্বিক মহামারী করোনার কারণে আমি স্বেচ্ছায় গৃহবন্দি হয়েছি মার্চের ২৩/২৪ তারিখে। আর এই গৃহবন্দিত্বই আমাকে স্মৃতিকথা লিখতে উদ্বুদ্ধ করেছে, সে কথা এর আগের লেখায় উল্লেখ করেছি। বক্ষমান নিবন্ধটি এখনই লেখার কথা ছিল না। কিন্তু এর আগে ফেসবুকে ‘প্রাসাদ ষড়যন্ত্র এবং শশ্রুমন্ডিত যুবক শিরোনামে প্রকাশিত লেখাটি পড়ে আমার বিশিষ্ট বন্ধু এটিএন বাংলা-র সদ্য সাবেক বিশেষ সংবাদদাতা আবু দারদা জুবায়ের ওরফে হাবিব আমাকে ত্রিশাল টু ময়মনসিংহ শিরোনামটি ঠিক করে দেন এবং এ বিষয়ে লেখার জন্য ফেসবুক বার্তায় ফরমায়েশ করেন। তার বার্তাটি ছিল এ রকম: Abudarda Zubair Habib আরো কিছু লিখুন ত্রিশাল টু ময়মনসিংহ থেকে ডাহা! লেখবাইন । অভিজ্ঞতার কথা । পড়তে চাই ভাই । আমি Abudarda Zubair Habib সাহেবের বার্তার উত্তরে লিখলাম: Jahangir Alam ওকে ধন্যবাদ ভাই। ত্রিশাল টু ময়মনসিংহ মোটর সাইকেলে ডাকাতের কবলে পড়েছিলাম আমি এবং আমার এক সাংবাদিক বন্ধু। ডাকাতরা কিভাবে ডাকাতি করেছিল তার শ্বাসরুদ্ধকর কাহিনী লিখবো কোনো একদিন। সব ডাকাত ধরা পড়েছিল এবং ওদের সাজাও হয়েছিল। দারদা ভাইকে দেওয়া সেই প্রতিশ্রুতি পূরণের লক্ষেই মূলত আজকের এই কাহিনীর অবতারণা। আর এই কাহিনীর সঙ্গে সংগত কারণেই এসেছে ময়মনসিংহ প্রেসক্লাবের আদ্যোপান্ত।   ঢাকার সাংবাদিকদের মধ্যে আবু দারদা জুবায়ের ওরফে হাবিব আমার প্রিয় মানুষদের একজন। তার ডাক নাম যে হাবিব তা জানলাম ফেসবুকের কল্যাণে। দেখা হলেই দারদা ভাই ( আমি তাকে দারদা বলতেই বেশি পছন্দ করি)। আবু দারদা নামের অর্থও জানতাম না। প্রযুক্তির কল্যাণে তার নামের অর্থ এবং ঐতিহাসিক গুরুত্ব জানতে পারলাম। মুক্ত বিশ্বকোষ উইকিপিডিয়া অনুসারে আবু দারদা আনসারী নামে হযরত মুহম্মদ (সা.)-এর একজন বিখ্যাত সাহাবী ছিলেন। কন্যা দারদার নাম অনুসারে তাঁর এ নাম এবং ইতিহাসে তিনি এ নামেই খ্যাত। তিনি ছিলেন আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী, অশ্বারোহী ও বিচারক। ইসলাম গ্রহণের পূর্বে ছিলেন মদীনার একজন সফল ব্যবসায়ী। Abu darda মূল নামের উৎপত্তি আরবি ভাষা থেকে। বাংলা অর্থ সফল বা বিজয়ী। এই নামের অর্থ এবং গুরুত্ব জেনে এখন বুঝতে পারছি তাকে দারদা ভাই ডাকার পিছনে আমার পছন্দের অন্তর্নিহিত রহস্য। তবে আবু দারদা জুবায়ের সাংবাদিক হিসেবে জীবনযুদ্ধে কতটা সফল বা বিজয়ী তা বুঝতে আমি অক্ষম, যখন জানলাম তিনি এখন বেকার। আবু দারদা বেসরকারি টিভি চ্যানেল এটিএন বাংলায় কাজ করেছেন দেড় যুগ, বিশেষ সংবাদাতা হিসেবে, এখন সদ্য সাবেক।  


আবু দারদার গ্রামের বাড়ি নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলায়। আর নানার বাড়ি ময়মনসিংহের ত্রিশালে। দারদা মায়ের নাড়ির টানে তাঁর মায়ের জন্মভূমিকে ভালোবাসেন। ভালোবাসেন ময়মনসিংহের মানুষকে। দারদা ভাইয়ের সঙ্গে ঢাকায় বহুবার দেখা হয়েছে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে। বছর দুই আগে কলকাতার মারকোস স্ট্রীটে দেখা হয়েছিল একদিন। প্যানডামিকের কারণে এখন দেখা সাক্ষাৎ বন্ধ, তাই জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকই ভরসা। দারদা ভাইয়ের সঙ্গে ফেসবুকে বার্তার আদান-প্রদান চলে নিয়মিত। গত সোমবার বিকেলে অনেকক্ষণ কথা হলো ফেসবুক মেসেঞ্জারে।   আমার প্রিয়পাত্র হেলাল যাক, এবার মূল প্রসঙ্গে ফিরে আসি। আমার এক সময়ের সহকর্মী মেসবাহ উদ্দিন হেলাল বিভিন্ন জটিল রোগে ভূগে ২০১৬ সালের ১১ জানুয়ারি পরলোক গমন করেন। আমার খুব প্রিয়পাত্র ছিলেন হেলাল। দৈনিক আজকের বাংলাদেশ-এর পর হেলাল ঢাকার দৈনিক নব অভিযান, আমার সম্পাদিত সাপ্তাহিক ময়মনসিংহ সমাচার এবং দৈনিক সবুজ-এ কাজ করেছেন, দৈনিক সবুজের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ছিলাম আমি। আমার সঙ্গে বিভিন্ন পত্রিকায় কাজ করার আগে হেলাল ময়মনসিংহের সাপ্তাহিক চাষী এবং দৈনিক ইনসাফ পত্রিকায় কাজ করতেন। আমার প্রিয় শিষ্য বাংলাভিশন-এর সদ্য সাবেক জেষ্ঠ্য বার্তা সম্পাদক মাসুদ কামাল মেসবাহ উদ্দিন হেলালের ছোট ভাই। প্রসঙ্গত বলতে হয়, আমি ১৯৮৮ সালে ঢাকার দৈনিক নব অভিযান-এ চিফ রিপোর্টার ছিলাম। সে সময় হেলাল নব অভিযানের ময়মনসিংহ প্রতিনিধি। একদিন সে আমাকে অনুরোধ করলো মাসুদ কামালকে নব অভিযানে নেওয়ার জন্য। মাসুদ কামাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতায় অনার্স, মাস্টার্স করে মতিঝিলে এক বন্ধুর সওদাগরি প্রতিষ্ঠানে সময় দিতো। এর আগে দৈনিক মিল্লাতের তিক্ত অভিজ্ঞতা মাসুদ কামালকে সাংবাদিকতা পেশা থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছিল। হেলালের প্রস্তাবে আর আমার অনুপ্রেরণায় সেই মাসুদ কামাল আবার নতুন করে সাংবাদিকতা শুরু করে।   ডাকাতের কবলে আমরা হেলালের সঙ্গে আমার সম্পর্কের স্মৃতি কথার শেষ নেই। কিন্তু এই স্বল্প পরিসরে সব কথা বলে শেষ করা যাবে না। তাই মূল প্রসঙ্গ সেদিনের সেই শ্বাসরুদ্ধকর ডাকাতির ঘটনায় ফিরে আসি।   ডাকাতদের অতর্কিত আক্রমণের মুখে আমি ভয় পেলেও দিশেহারা হইনি। ওরা সংখ্যায় ছিল পাঁচ/ছ’জন। দুইভাগে বিভক্ত হয়ে আমার আর হেলালের দেহতল্লাশি শুরু করে। যদিও ঘন কুয়াশার কারণে আমি আর হেলাল কেউ কাউকে দেখতে পাচ্ছিলাম না।আমাকে রাস্তার ডানপাশে নিয়ে গিয়ে ডাকাতদের একজন আমার হাতে কিরিচের বাট দিয়ে আঘাত করে জানতে চাইলো “এই শালা তোর লগে কি আছে সব বাইর কর। আমি ভাবছি স্যুট, কোট টাই পরা এক ভদ্রলোকের সঙ্গে একি অভব্য আচরণ এই পুঁচকে ছেলেটার? ঘোর কেটে গেলে বুঝলাম আমি এখন ডাকাতদের হাতে বন্দি একজন অসহায় মানুষ মাত্র। এখানে সভ্য, ভব্যের কি আর থাকতে পারে? পরিণত বয়সে এই প্রথম কারো হাতে মার খেয়ে আর গালি শুনে যদিও আমার খুব খারাপ লাগছিল কিন্তু সাহস সঞ্চয় করে বেশ উচ্চকণ্ঠে ধমকের সুরে বললাম, ‘দেখ্, আমি ভদ্রলোক মানুষ, গালাগালি করবি না। যা আছে সব দিয়ে দিব। আমার কথা শুনে ডান পাশে থাকা ডাকাতটি ওর সঙ্গীকে মৃদু ভৎর্সনা করে বললো, “এই মারিছ না, কইছে তো দিবো। এক ডাকাত যখন কথা বলছে অন্যজন তখন আমার মাথার টুপি, হাত মোজা, ঘড়ি আর কোট খুলতে ব্যস্ত। আমার পরনে থ্রি পিস স্যুট। শ তিনেক টাকাসহ কোট খুলে নেওয়ার পর মনে শংকা জাগলো, শেষপর্যন্ত কি ওরা আমার পরনের সব কাপড়-খুলে আমাকে বিবস্ত্র করে ফেলবে? শংকামুক্ত হলাম যখন দেখলাম ওরা আর আমার দেহ তল্লাশি করছে না। ডাকাতদের একজন বেশ কর্কশ কণ্ঠে বললো, ‘এখন সিদা যাইবি, এইদিক ওইদিক তাকাইবি না। এ যেন ধঢ়ে প্রাণ ফিরে পাওয়ার অবস্থা। ডাকাতরা আমাদের টাকা-পয়সা, কাপড়-চোপড় হাতিয়ে নিতে খুব বেশি সময় নেয় নি, বড়জোর মিনিট দশেক। আমার পিছন পিছন হেলালও রাস্তায় উঠে এলো। নীরবে বাইকটি উঠিয়ে স্টার্ট দিলো। হেলাল খুব আস্তে আস্তে বাইক চালাচ্ছে, কিছুদুর যাওয়ার পর বললো, ‘জাহাঙ্গীর ভাই, হাতে খুব ব্যাথা হচ্ছে, মেডিকেলে যেতে হবে। ঘটনাস্থল থেকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দূরত্ব বড়জোর ৩ কিলোমিটার। ১০/১৫ মিনিটের মধ্যেই আমরা হাসপাতালের ইমার্জেন্সিতে পৌঁছে গেলাম। হেলাল ইমার্জেন্সি মেডিকেল অফিসারের সামনে গিয়ে টেলিফোন রিসিভার হাতে তুলে নিলো। চিৎকার করে বলতে লাগলো, এসপি সাহেব আমরা কি ময়মনসিংহ শহরে থাকতে পারবো না? এসপিকে ঘটনার আনুপূর্বিক বিবরণ দিলো হেলাল। এসপি সাহেব কি বললেন জানি না। তখন ময়মনসিংহের এসপি ছিলেন আলতাফ হোসেন। হেলাল অনর্গল বলেই চলেছে, ডাকাতরা আমাদের প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দিয়েছে। কিরিচের আঘাতে আমার হাত ভেঙ্গেছে, জাহাঙ্গীর ভাইকেও মেরেছে, আমাদের যা কিছু ছিল সব ছিনিয়ে নিয়েছে। এখন আপনি বলেন, আমরা কি ময়মনসিংহ শহর ছেড়ে যাবো? এসপি সাহেব হেলালকে কি বলেছিলেন আমি শুনতে পাইনি। ফোন রেখে হেলাল বললো, এসপি সাহেব আমাদের হাসপাতালে অপেক্ষা করতে বলেছেন, ওসিকে পাঠাচ্ছেন। কিছুক্ষণ পর কোতোয়ালি থানার ওসি শেখ আতাউর রহমান হাসপাতালের ইমার্জেন্সিতে ফোন করে হেলালকে বললেন, আপনারা হাসপাতালে থাকেন, আমরা আসছি। এক্সরে করার পর দেখা গেল হেলালের হাত কব্জির উপ র থেকে ফ্র্যাকচার হয়েছে। কিছুক্ষণ পর কোতোয়ালি থানার ওসি ফোর্স নিয়ে হাসপাতালে হাজির হলেন। আমাদের বললেন, চলেন এক্ষুনি ঘটনাস্থলে যাবো। আমরা পুলিশের টহল গাড়িতে করে ঘটনাস্থলে গেলাম। ওসি ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে আমাকে এবং হেলালকে যার যার বাসায় পৌঁছে দিলেন।  

 পুলিশের রাতভর অভিযান
ঘটনার পর দিন সকাল ন’টার দিকে থানা থেকে একজন কনস্টেবল আমার বাসায় এসে জানালেন, স্যার সব ডাকাত রাতেই মালসহ ধরা পড়ছে। থানায় আছে, ওসি স্যার আপনারে সালাম দিছে। থানায় গেলাম, হেলাল এবং সাংবাদিক মোশাররফ হোসেনও এসেছে। এই মোশাররফকে সাংবাদিকতায় এনেছিলেন হেলাল। আমার সঙ্গে আজকের বাংলাদেশেও কাজ করেছে মোশাররফ। এখন ময়মনসিংহের খবর নামে একটি দৈনিক পত্রিকার সম্পাদক। কিছুক্ষণ পর থানায় এলেন, কেওয়াটখালী ইউনিয়ন পরিষদের চার চারবারের নির্বাচিত জনপ্রিয় চেয়ারম্যান মো, আব্দুল মালেক। যাকে আমি মালেক মামা বলে ডাকতাম। এই মালেক চেয়ারম্যান সম্পর্কে জনমনে নানারকম বিভ্রান্তি আর অভিযোগ ছিল। কিন্তু সাংবাদিক হিসেবে আমি এসব অভিযোগের সত্যতা খুঁজে পাইনি কখনো। যাইহোক, এই মালেক চেয়ারম্যানকে সঙ্গে নিয়ে পুলিশ সারারাত দিঘারকান্দা গ্রামের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে ওই ডাকাতদেরসহ সন্দেহভাজন অনেক লোককে আটক করে থানায় নিয়ে আসে। ওসির চেম্বারে ডাকাতদের মুখোমুখি করা হয় আমাদের। ঘটনার রাতে যদিও ঘুটঘুটে অন্ধকার ছিল কিন্তু মাঝে মাঝে হাইওয়েতে চলাচলকারী দু/একটা পণ্যবাহী ট্রাকের হেড লাইটের আলো আমাদের উপর এসে পড়ছিল। ওই আলো-আঁধারিতে আমি দু’জন ডাকাতের মুখ আবছা দেখতে পেয়েছিলাম। দেখলাম থানায় আমাদের মুখোমুখি করা ডাকাতদের মধ্যে ওই দুই ডাকাতও আছে। ওদের একজন আমাকে দেখেই আমার পা জড়িয়ে ধরলো। কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে বলতে লাগলো, স্যার আমি আপনারে বাঁচাইছি না? আমি বললাম হা বাবা, তু্মিই তো আমাকে বাঁচাইছো । ওই ডাকাত এবার মালেক চেয়ারম্যানকে উদ্দেশ্য করে বলতে শুরু করলো, চেয়ারম্যান সাব আমরা তো আপনেরে ভোট দিয়া চেয়ারম্যান বানাইছি। আমগোরো ধইরা আনছেন ক্যান? প্রতুত্তরে চেয়ারম্যান বললেন, ভোট দিছস দেইখ্যা ডাকাতি করবি। দোষ করছস জেল খাইট্টা আয়, পরে চাকরি লইয়া দিমু। মোশাররফের কাছে পরে শুনেছি সাজা খেটে আসার পর মালেক চেয়ারম্যান ঠিকই ওদের কয়েকজনকে চাকরি জুটিয়ে দিয়েছিলেন। এই লেখাটি লেখার সময় মোশাররফ জানালো একসময়ের জনপ্রিয় ওই মালেক চেয়ারম্যান বছর তিনেক আগে মারা গেছেন।   

ডাকাতদের বিরুদ্ধে চার্য গঠন
পুলিশ ওই ছয় ডাকাতের বিরুদ্ধে চার্য গঠন করলো। এরা পেশাদার ডাকাত ছিল না, এটা সঠিক। বেকার ছিল। যার পরিকল্পনায় এই ডাকাতি সেই মাস্টারমাইন্ড কিন্তু গ্রেফতার এড়িয়ে আত্মগোপনে চলে যায়। তার অনুপস্থিতে বিচার শুরু হয় আদালতে।আদালতে মামলা গড়ানোর আগে এক ডাকাতের বড় ভাই, পেশায় বাস ড্রাইভার আমার আর হেলালের নাওয়া-খাওয়া হারাম করে দিয়েছিল। সঙ্গদোষে ছোট ভাইটি বখে গেছে, ও ভুল করেছে, মাফ করে দেন, আপনারা চাইলে চার্যশিট থেকে ওর নামটি কেটে দিতে পারেন, ইত্যকার নানা অনুরোধ সে বারবার করেছে আমাদের। হেলাল এবং আমি বাস ড্রাইভারের প্রতি কিছুটা সহানুভূতিশীল হলেও চার্যশিট থেকে ওর ভাইয়ের নাম বাদ দেওয়ার আইনগত কোনো ক্ষমতা আমাদের ছিল না।   

আদালতে মামলার শুনানি
এ দিকে মামলার শুনানির দিন সরকার পক্ষের উকিল অ্যাডভোকেট বজলুর রহমান আমাদের সাফ জানিয়ে দিলেন আসামিরা পুলিশের কাছে দোষ স্বীকার করেছে, সুতরাং আপনারা আসামিদের শনাক্ত করবেন। এখানে ছাড় দেওয়ার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। আমরা আদালতে ডাকাতদের সবাইকে শনাক্ত করলাম। আসামি পক্ষের উকিল ছিলেন অ্যাডভোকেট শাহজাহান সিরাজী। তিনি আবার খন্ডকালীন সাংবাদিক, কবিতাও লিখতেন। ময়মনসিংহ প্রেসক্লাবের সদস্য। আজকের ময়মনসিংহের সম্পাদক মোশাররফ হোসেনের কাছে শুনলাম শাহজাহান সিরাজী এখন থেকে বছর দুই আগে ইহলোক ত্যাগ করেছেন। এই উকিল সাহেব জেরার সময় অপ্রাসঙ্গিকভাবে ময়মনসিংহ প্রেসক্লাবে আমার সদস্যতা নিয়ে আমাকে নানা প্রশ্নবাণে জর্জরিত করলেন। উকিল সাহেবের বক্তব্য ছিল: সংগঠন বিরোধী কার্যকলাপের দায়ে প্রেস ক্লাবে আমার সদস্যতা খারিজ করা হয়েছে। জবাবে আমি বলেছিলাম, প্রেসক্লাব অসাংবাদিক অধ্যুষিত এবং তাদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, সাংবাদিকদের এক্সপ্লয়েট করে অসাংবাদিক সদস্যগণ প্রেস ক্লাবের সব সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছেন। আমি সাংবাদিকদের পক্ষে এর প্রতিবাদ করেছি এবং এখনো করি। এ বিষয়টি নিয়ে আদালতে মামলা হয়েছে, সুতরাং নীতিগত কারণে আমি স্বেচ্ছায় প্রেসক্লাবে যাতায়াত বন্ধ করেছি।   

ময়মনসিংহ প্রেস ক্লাবের আদ্যোপান্ত
ময়মনসিংহ প্রেস ক্লাবের জন্ম ১৯৫৯ সালে শুধুমাত্র সাংবাদিকদের নিয়ে । প্রথম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন মরহুম কেতাব আলী তালুকদার, ১৯৫৯-১৯৬০ সাল পর্যন্ত। কিছু অপ্রিতীকর ঘটনাকে কেন্দ্র করে ক্লাবের গঠনতন্ত্র ছেটে ফেলা হয় এবং ক্লাবে অসাংবাদিকদের অনুপ্রবেশের পথ উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। বিচিত্র এই গঠনতন্ত্র দিয়েই বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ময়মনসিংহ প্রেস ক্লাব পরিচালনা শুরু হয়। ১৯৭২ সালে প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন বিশিষ্ট আওয়ামী লীগ নেতা এবং সাংবাদিক সৈয়দ আহমদ, আমাদের প্রিয় সৈয়দ ভাই। ১৯৭২ সালে পাকিস্তান আমলে রচিত ক্লাবের গঠনতন্ত্র পরিমার্জন করা হলো নামকাওয়াস্তে । ঘষা-মাজা করা হলো শুধু পাকিস্তান সম্পৃক্ত শব্দগুলো। এই তথাকথিত পরিমার্জিত গঠনতন্ত্রে ‘জেলা প্রশাসক পদাধিকার বলে ময়মনসিংহ প্রেসক্লাবের সভাপতি এবং শিল্প সাহিত্যে উৎসাহী যে কোনো ব্যক্তি ময়মনসিংহ প্রেসক্লাবের পূর্ণ সদস্য হওয়ার যোগ্য কথাগুলো অবিকৃতভাবেই রেখে দেওয়া হলো।   খ্যাতিমান সাংবাদিক আবদুল গাফফার চৌধুরী সম্পাদিত দৈনিক জনপদে থাকাকালীন আমি ১৯৭৩ সালে ময়মনসিংহ প্রেসক্লাবের সদস্যতা গ্রহণ করি। সে সময় প্রেস ক্লাবে গিয়ে দেখতাম, তাসের টেবিলে স্কুল-কলেজের শিক্ষকদের জমজমাট আড্ডা। আর আমরা যারা বয়সে অপেক্ষাকৃত তরুণ সাংবাদিক তাসের ঘরে তাদের প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত ছিল। খুব সমীহ করে কথা বলতে হতো অসাংবাদিক শিক্ষক সদস্যদের সঙ্গে। স্যার ডাকা একরকম রেওয়াজে পরিণত হয়েছিল। প্রেস ক্লাব তো নয়, এ যেন ওই শিক্ষক মহাশয়দের পাঠশালা আর আমরা তাদের ছাত্র, এরকম একটা অবস্থা । সত্যি বলতে কি, সাংবাদিকদের একটি প্রতিষ্ঠানকে এতো নগ্নভাবে কুক্ষিগত করার নজির খুঁজে পাওয়া দুস্কর।   এ তো গেল প্রেসক্লাবের অন্দর মহলের বয়ান। সাংগঠনিক কাঠামোর কথা কি আর বলবো। বড়ই বিচিত্র এবং নজিরবিহীন প্রেসক্লাবের সাংগঠনিক কাঠামো। ময়মনসিংহ জেলার জেলা প্রশাসক পদাধিকার বলে প্রেসক্লাবের সভাপতি। একজন জেলা প্রশাসক কি করে শতভাগ একটি সাংবাদিক প্রতিষ্ঠানের সভাপতি হন? বিষয়টি যেমন আগেও আমার মাথায় ঢুকতো না, তেমনি এখনো ঢোকে না। বিশ্বের কোথাও এমন নজির আছে কিনা, এই অধমের তা জানা নেই।   ময়মনসিংহ প্রেসক্লাবের সাংগঠনিক কাঠামো পরিবর্তনের জন্য অর্থাৎ এটি শতভাগ সাংবাদিকদের প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা এবং তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখার নীতির আলোকে স্বাধীনতাত্তোর ময়মনসিংহের সংবাদপত্রের পাইওনিয়ার বা পূরোধা ব্যক্তি প্রয়াত মো. হাবিবুর রহমান শেখের (যিনি শেখ হাবিব নামেই সমধিক পরিচিত) নেতৃত্বে বহু আন্দোলন সংগ্রাম হয়েছে। হয়েছে মামলা-মোকদ্দমা। কিন্তু প্রেসক্লাবের অসাংবাদিক সদস্যদের ষড়যন্ত্রে সব আন্দোলন-সংগ্রাম নস্যাৎ হয়েছে। অবশ্য এই অসাংবাদিক সদস্যদের ষড়যন্ত্রের মদদদাতা ছিলেন কিছু নামধারী তথাকথিত সাংবাদিক সদস্য। খন্ডকালীন বা নামকাওয়াস্তে বা বিনাবেতনে নামসর্বস্ব পত্রিকার কার্ডধারী কিছু লোক সাংবাদিক সেজে প্রেসক্লাবের সদস্য হয়ে যেমন সব সুযোগ সুবিধা ভোগ করেন তেমনি প্রয়োজনে ষড়যন্ত্রকারীদের সঙ্গেও হাত মেলাতে পিছপা হন না। এদের অনেকের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বহর দেখলে মাথা হেঁট হয়ে যায়। নিম্ন মাধ্যমিক থেকে শুরু করে আরো নিম্ন পর্যায়ের শিক্ষাগত যোগ্যতার অধিকারী এসব লোক। একসময় কেউ ছিল হোটেল বয়, কেউ বা আবার পাটকল শ্রমিক।   সাংবাদিকদের একটি প্রতিষ্ঠানে অসাংবাদিকদের পূর্ণ সদস্যতা পাওয়ার নজির একমাত্র মমনসিংহ প্রেস ক্লাবেই আছে। সুযোগ পেলে অংসাবাদিকরা এটিকে গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে স্থান করে দিতেও কসুর করতো না। অথচ প্রেসক্লাবের জন্মলগ্নে এ নিয়মটি ছিল না। শুরুতে সাংবাদিকদের নিয়েই ক্লাব গঠন করা হয়েছিল যা আগেই বলেছি। কিন্তু অসাংবাদিকের প্রবেশাধিকার অবাধ করার লক্ষে ক্লাবের গঠনতন্ত্র পরিবর্তন করা হয়। কয়েকজন প্রভাবশালী সাংবাদিককে কব্জা করে স্কুল-কলেজের বেশ কিছু শিক্ষক ক্লাবের স্থায়ী সদস্যতা বাগিয়ে নেন। এক সময় এই অসাংবাদিকরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে প্রেসক্লাবকে কুক্ষিগত করে সাংবাদিকদের ওপর ছড়ি ঘোরাতে শুরু করে। সাংবাদিকদের অবস্থা দাঁড়ায় না ঘরকা না ঘাটকার মতো। নতুন সাংবাদিক সদস্যতা দেওয়ার ব্যাপারে গোপনে শলা-পরামর্শ করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতেন অসাংবাদিক সদস্য নেতারা।   এদিকে প্রেসক্লাবের সদস্যতা নেওয়ার জন্য আসাংবাদিকদের মধ্যে প্রতিযোগিতার বেশকিছু কারণও ছিল। প্রেসক্লাবের সদস্যতা নিয়ে নিজের মানমর্যাদা বৃদ্ধি, প্রশাসনের কাছাকাছি যাওয়ার অবাধ একটা সুযোগ তৈরি, ক্লাবে নিশ্চিন্তে বসে তাস খেলা এবং নামমাত্র মূল্যে বিরিয়ানি খাওয়া এবং বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ ইত্যাদি। প্রেসক্লাব কেনটিনে এখন আমজনতার কাছে প্রতিপ্লেট বিরিয়ানি বিক্রি হয় ৯০ টাকা। আর ক্লাবের সদস্যদের জন্য তা মাত্র ২০টাকা । এসব সুযোগ সুবিধা যারা বেশি ভোগ করতেন তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ অসাংবাদিক সদস্য। কেউ কেউ গোপনে আমলাদের কাছ থেকে সুযোগ মতো বড় বড় সুবিধা বাগিয়ে নিয়েছেন এমন কথাও শোনা যায়। একটি বিষয়ে দ্বিমতের কোনো অবকাশ নেই যে, প্রেসক্লাবের যা কিছু উন্নতি হয়েছে তার সবকিছুতেই সরকারি সহযোগিতাই ছিল মুখ্য এবং তা সম্ভব হয়েছে শুধুমাত্র সাংবাদিকদের জন্যই।   

প্রেসক্লাবের ‘সোনার খনি’
এখনকার প্রেসক্লাবকে অনেকে ‘সোনার খনি’র সঙ্গে তুলনা করেন। তাদের মতে ক্লাবের নতুন ভবনটিই প্রকৃতপক্ষে এই ‘সোনার খনি’। আর এই ‘সোনার খনি’র আবিস্কারকরা হচ্ছেন প্রেসক্লাবের চার মেয়াদের সাধারণ সম্পাদক মোশাররফ হোসেন এবং সহেযোগী সাংবাদিকবৃন্দ। শুনেছি, মোশাররফ হোসেন এবং অন্য সাংবাদিকদের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল হচ্ছে এই ‘সোনার খনি’ খ্যাত ক্লাবের নতুন ভবন। ১৯৯৯ সালে ভবনটি নির্মাণ করা হয়। এই নতুন ভবনে ইলেকট্রিক এবং ইলেকট্রনিক্স সামগ্রীর অনেক দোকান রয়েছে। দোকান ভাড়া থেকে প্রতি মাসে ২৫/৩০ লাখ টাকা প্রেসক্লাব তহবিলে আসে। এখন বেশ কয়েক কোটি টাকা জমা আছে প্রেসক্লাব তহবিলে। শুনলাম, এই কল্যাণ তহবিল থেকে ২০২২ সালে সাংবাদিক, অসাংবাদিক নির্বিশেষে প্রত্যেক সদস্যকে ৫ লাখ টাকা করে অনুদান দেওয়া হবে। অনুদানের টাকার ভাগিদার অসাংবাদিকরা কেনো হবেন? এই প্রশ্ন তুলে ক্লাবের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং বেশ কয়েক মেয়াদে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী প্রবীণ সাংবাদিক মো. মোমতাজ উদ্দিন প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তিনি শুধু প্রতিবাদ করেই ক্ষান্ত হন নি বরং প্রতিবাদস্বরুপ এই ৫ লাখ টাকার অনুদান না নেওয়ারও ঘোষণা দিয়েছেন। অন্যদিকে একজন বিবেকসম্পন্ন অসাংবাদিক সদস্যও এই অনুদানের টাকা শুধুমাত্র সাংবাদিকদেরই প্রাপ্য এমন অভিমত ব্যক্ত করে বিনয়ের সঙ্গে অনুদানের ৫ লাখ টাকার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন । অনুদান নিতে অস্বীকৃতি জানানো এই ব্যক্তিটি হচ্ছেন ময়মনসিংহের অন্যতম ঢনাঢ্য ব্যবসায়ী, সৈয়দ ফারুকী। প্রেসক্লাবের কোনো এক বার্ষিক সাধারণ সভায় বিষয়টি নিয়ে সরব হয়েছিলেন ফারুকী। সেখানে তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন, যেহেতু প্রেসক্লাব সাংবাদিকদের একটি প্রতিষ্ঠান সেহেতু প্রেসক্লাবের ন্যায়সংগত সমস্ত সুযোগ-সুবিধা একমাত্র সাংবাদিকদেরই প্রাপ্য। তিনি আরো বলেন, সময়ের প্রয়োজনে আমরা (অসাংবাদিক) প্রেসক্লাবের সদস্য হয়েছিলাম। অনেক অসাংবাদিক সদস্যও সৈয়দ ফারুকীর মতো চিন্তা চেতনা পোষণ করেন। ন্যায়নীতির প্রশ্নে অনেক অসাংবাদিক সদস্য আর প্রেসক্লাবের সঙ্গে যুক্ত থাকতে চান না, এমন কথাও শোনা যায়।  

 ডিসির আদেশ বাতিল
আনসার আলী সিদ্দিকী সাহেব ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক ছিলেন। চাকরিজীবন শেষে তিনি ৯১ সালে বিএনপি সরকারের প্রতিমন্ত্রী হয়েছিলেন। সম্ভবত তিনি ১৯৭৮ সালে ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক হয়ে আসেন। পেশার প্রয়োজনে সবসময় আমি তাঁর আন্তরিক সহযোগিতা পেয়েছি। আমি তখন দৈনিক বাংলা, বিটিভি (বাংলাদশ টেলিভিশন) এবং বাংলাদেশ বেতারের ময়মনসিংহ জেলা প্রতিনিধি। ১৯৮৩ সালের দিকে এই ডিসি ভদ্রলোক ময়মনসিংহ প্রেসক্লাব নিয়ে একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নেন। তিনি প্রেসক্লাবের গঠনতন্ত্র বাতিল করে সাংবাদিকদের হাতে এর পরিচালনা ভার ন্যাস্ত করা সংক্রান্ত একটি আদেশ জারি করেন। নতুন করে গঠনতন্ত্র প্রণয়নের লক্ষ্যে সাংবাদিকদের নিয়ে একটি কমিটিও গঠন করে দেন। কিন্তু নানা অজুহাতে, (কেউ কেউ আবার এতে অসাংবাদিকদের গোপন ষড়যন্ত্রের গন্ধও পান) নতুন এই কমিটি প্রেসক্লাবের গঠনতন্ত্র সংশোধনের সুযোগ কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয় অথবা তাদের ব্যর্থ করে দেওয়া হয়। এখানেও অসাংবাদিক সদস্যরা খুব নিপূণভাবে কলকাঠি নেড়েছে বলে কোনো কোনো মহলের ধারনা । প্রেসক্লাবের এমনি এক অচলাবস্থার মুখে আনসার আলী সিদ্দিকী ঢাকায় বদলী হয়ে যান।  

প্রেসক্লাব নাটকের ক্লাইমেক্স
ময়মনসিংহের নতুন জেলা প্রশাসক হয়ে এলেন এম.এ মান্নান। ( বর্তমানে বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় মন্ত্রী, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়) । এম.এ মান্নান সাহেব স্বাধীনতার পর একসময় ময়মনসিংহ সদর মহকুমার এসডিও ছিলেন। তাঁর সঙ্গে তখন থেকেই আমার পরিচয়। একজন সৎ এবং সজ্জন মানুষ হিসেবে ঈর্ষণীয় সুনামের অধিকারী এম.এ মান্নান সিএসপি কর্মকর্তা হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন।   ময়মনসিংহে তাঁর আগমনে প্রেসক্লাবের অসাংবাদিক সদস্যরা ধড়ে প্রাণ ফিরে পেলেন। কিছু সাংবাদিক সদস্যকে হাত করে বা আগে যারা অসাংবাদিক সদস্যদের বন্ধু-বান্ধব ছিলেন এমন লোকজন মিলেমিশে সাংবাদিকদের দীর্ঘদিন পরের অর্জনকে বিসর্জন দেওয়ার পথ খুঁজতে লাগলেন। আর নতুন জেলা প্রশাসক মহোদয়ের আগমন তাদের জন্য আশির্বাদের বার্তা নিয়ে এলো। নতুন জেলা প্রশাসককে তারা বুঝাতে সক্ষম হলেন প্রেসক্লাবে জেলা প্রশাসকের পদাধিকার বলে সভাপতির পদটি কতো মর্যাদাপূর্ণ এবং সম্মানের। আদতে কি তাই? এ প্রশ্নের উত্তর কে দিবে?   যাইহোক, এরপর প্রেসক্লাব নাটকটি ক্লাইমেক্স বা শেষ পরিণতির দিকে অগ্রসর হয়। ভূতপূর্ব জেলা প্রশাসকের অর্ডার বাতিল হয়ে গেলো। ময়মনসিংহ প্রেসক্লাব আবার তার পুরনো অবয়ব ফিরে পেলো। অসাংবাদিকদের দাপট বহুগুণ বেড়ে গেলো। আর এভাবেই সাংবাদিকদের ন্যায়সংগত অধিকার প্রতিষ্ঠার যুগান্তকারী একটি পদক্ষেপের অপমৃত্যু হলো।  


শুনেছি প্রেসক্লাবে জেলা প্রশাসকের পদাধিকার বলে সভাপতি সংক্রান্ত ধারাটি বাতিল করার জন্য ২০০৬ সালে বার্ষিক সাধারণ সভায় প্রস্তাব পাশ হয়। কিন্তু প্রস্তাবটি বাস্তবায়নের আগেই রেজুলেশন বুক বা প্রস্তাবের খাতাটি কে বা কারা উধাও করে দেয়, পরে বিষয়টি ধামাচাপা পড়ে যায়। এমনিভাবে প্রেসক্লাবের হিসাবের কতো খাতা, পেন্সিল আর টাকা-পয়সা উধাও করা হয়েছে তার হিসাব কে রাখে?   সাংবাদিকদের সদস্যতা দিতে আপত্তি কোথায়?
ময়মনসিংহ এখন বিভাগীয় শহর, পত্রপত্রিকা প্রকাশনার কলেবর দিন দিন বাড়ছে। সাংবাদিকের সংখ্যাও নেহায়েত কম নয়। ময়মনসিংহ প্রেস ক্লাবে এসব সাংবাদিককে সদস্য না করায় এরা ছোট ছোট দলে উপদলে বিভক্ত হয়ে বিভিন্ন নামে শহরের অলিতে গলিতে প্রেস ক্লাব বা এ জাতীয় সংগঠন গড়ে তুলতে বাধ্য হয়েছেন। ময়মনসিংহ প্রেসক্লাবের বাইরে থাকা এসব সাংবাদিকের অনেকেই দাবি করে বলেছেন, ময়মনসিংহ প্রেস ক্লাব যেহেতু শতভাগ সাংবাদিকদের প্রতিষ্ঠান সেহেতু আমাদের সদস্যতা দিতে আপত্তি কোথায়? ওখানে সদস্য হওয়া এবং সম্পদের ভাগিদার হওয়ার ন্যায়সংগত অধিকার ময়মনসিংহের সব সাংবাদিকের আছে। তারা এও বলেছেন, প্রশাসন চাইলে সহজেই এ সমস্যার একটা সন্তোষজনক সমাধান সম্ভব। ময়মনসিংহের সিংহভাগ সাংবাদিক একটি একক প্রেস ক্লাব গঠনের পক্ষপাতি। আর সেটি হওয়াও অসম্ভব নয়। এখন শুধুই সময়ের অপেক্ষা, নিজেদের ন্যায়সংগত অধিকার আদায়ে সাংবাদিকদের এগিয়ে আসার।

About Bappy Chowdhury

Check Also

ত্রিশালে বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালিত

ফারুক আহমেদ, ত্রিশাল প্রতিনিধি: গতকাল সোমবার ময়মনসিংহের ত্রিশালে বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *