শনিবার , ডিসেম্বর ৫ ২০২০
   শনিবার|২০শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ|৫ই ডিসেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ
    ১৯শে রবিউস সানি, ১৪৪২ হিজরি
Breaking News

সাংবাদিক ও সাংবাদিকতা কি ?

সাংবাদিক ও সাংবাদিকতা কি ?

What is Journalist and Journalism ?

একেএম ফখরুল আলম বাপ্পী চৌধুরী: শব্দগত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, সাংবাদিক ও সাংবাদিকতার প্রতিশব্দ জার্নালিস্ট (Journalist) ও জার্নালিজম (Journalism)। Journal’ অর্থ কোন কিছু প্রকাশ করা। ‘ism’ অর্থ চর্চা বা অনুশীলন। তাহলে সাংবাদিকতা (Journalism) হচ্ছে- কোন তথ্য প্রকাশ করার লক্ষ্যে চর্চা বা অনুশীলন করা। এসব শব্দ ‘জার্নাল’ থেকে এসেছে। এ জন্য যিনি জার্নাল বিশারদ আমরা তাকেই এক কথায় সাংবাদিক বলতে পারি। সাধারণত সাংবাদিক বলতে যিনি সংবাদ লিখেন তাকেই বুঝায়। যিনি সংবাদ লিখেন একমাত্র তিনিই সাংবাদিক নন। বরং সংবাদপত্রে বা বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রত্যক্ষভাবে এ পেশার সাথে জড়িত প্রত্যেককেই সাংবাদিক বলা যায়।  

সাংবাদিকতা একটি ব্যাপক ও বহুমাত্রিক অর্থে ব্যবহৃত শব্দ। অনেকেই বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে সাংবাদিকতাকে সংজ্ঞায়িত করেছেন। ভিন্ন ভিন্ন মত পার্থক্য রয়েছে। সাংবাদিকতাকে কোন সুনির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য,মানদন্ড বা কাঠামোয় সীমাবদ্ধ করা সম্ভব নয়। নানামাত্রিক সীমাবদ্ধতার কারণে সার্বজনীনভাবে একে সংজ্ঞায়িত করা একটি দুঃসাধ্য প্রয়াস।  

হ্যাঁ, প্রিয় পাঠক ও শিক্ষার্থীবৃন্দ চলুন- নিজের মতো করে সংজ্ঞায়িত করি- বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সাংবিধানিক আইন কানুন, প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যাবলির প্রতিদিনের একই চিত্র যা যুগে যুগে, শতাব্দী অববাহিকা চলমান তা তুলে ধরা সাংবাদিকতা নয়, বিজ্ঞাপন। 

রাষ্ট্রীয় সাংবিধানিক নিয়মের অনিয়ম, আইনের বেআইন, প্রকৃতির প্রতিদিনের একই চিত্রের বাইরে গুপ্ত বা সাম্প্রতিক অনাকাঙ্খিত ঘটে যাওয়া ঘটনার সঠিক তথ্য প্রমাণসহ বিস্তারিত বিশ্লেষণ হুবহু বিভিন্ন গণমাধ্যমে অবহিত করাকে সাংবাদিকতা বলে।  

এক কথায়, “অগোচরে পরে থাকা তথ্যকে সকলের গোচরে যে নিয়ে আসে তাকে সাংবাদিক বলে”। সাংবাদিকতা হলো মানব সমাজ, জীববৈচিত্র্য, প্রকৃতির বৈশিষ্ট্য, রাষ্ট্রের গতিবিধি বর্ণনার এক প্রকৌশল।  

যেমন: সূর্য পূর্ব দিক থেকে উঠে পশ্চিমে অস্ত যায় এটা গণমাধ্যমকে অবহিত করা সাংবাদিকতা নয়। এটা প্রকৃতির নিয়ম। প্রশাসনিক কর্মকর্তা যখন রাষ্ট্রের অর্পিত দায়িত্ব পালন করে এটা কখনো সংবাদ বা খবর হতে পারে না, এটা বিজ্ঞাপন। কারণ রাষ্ট্র তাঁদেরকে স্ব-স্ব পদে নিয়োগ দিয়েছে অর্পিত দায়িত্ব পালনের জন্য। যদি কোন প্রশাসনিক দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়, বা নিয়মের অনিয়ম করে তখন তা গণমাধ্যমে প্রকাশ করাই সাংবাদিকতা।  

সাংবাদিকতা একটি বহুমাত্রিক সামাজিক দায়িত্বশীল পেশা। তথ্যায়ন ও বিশ্বায়নের বর্তমান যুগে মানব সম্পদ উন্নয়নের অন্যতম মৌলিক কৌশল বা উপায় হলো তথ্যায়ন ও ধারণায়ন। সমাজের এই গুরুদায়িত্বটি সুচারু রূপে যারা পালন করে থাকেন তাকে সাংবাদিক বলে।  

সাংবাদিকতার জগৎ এখন তথা আধুনিক বিশ্বে বিশাল ও বিস্তৃত। মানুষের তথ্য জানার অধিকার এবং গণমাধ্যমের তথ্য জানানোর দায়বদ্ধতার প্রশ্নে সামাজিক অঙ্গীকার নিয়ে সাংবাদিকতা সমাজ-রাষ্ট্র এমনকি মানব সভ্যতার অগ্রযাত্রায় প্রতিনিয়ত প্রহরী বা পর্যবেক্ষকের ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে।  

সাংবাদিকতাকে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসাবে মূল্যায়ন করা হয়। গুরুত্বের বিচারে রাষ্ট্রের আইন, বিচার ও নির্বাহী বিভাগের পরেই সংবাদক্ষেত্রের স্থান হলেও প্রথমোক্ত তিনটি স্তম্ভ এই চতুর্থ স্তম্ভ ছাড়া বর্তমান যুগে বহুলাংশে অকার্যকর ও অসম্পূর্ণ। এ সম্মানটুকু বজায় রাখার দায়িত্বও সাংবাদিকদের। সমাজের প্রতিটি মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা নিয়ে এই মহান পেশাতে নিয়োজিত থেকে নীতিবোধ ও নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে এ পেশাকে কলংকিত করা সাংবাদিকের কর্তব্য নয়। এ পেশায় স্বাধীনতা থাকতে পারে, কিন্তু স্বেচ্ছাচারিতা থাকা বাঞ্চনীয় নয়। স্বেচ্ছাচারিতা তথা মনের মাধুরী মিশিয়ে গল্প তৈরি করা সাংবাদিকতার নৈতিকতার মধ্যে পড়ে না, সংবাদের প্রয়োজনে ঘটনা তৈরি করা সাংবাদিকতা নয়।  

মনে রাখতে হবে সংবাদের প্রয়োজনে ঘটনা সৃষ্টি হয় না, সমাজে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলিই সংবাদ হিসাবে প্রকাশিত হয়। কুকুর মানুষকে কামড়ালে সেটা সংবাদ হয় না, কিন্তু মানুষ কুকুরকে কামড়ালে সেটা সংবাদ হিসাবে পরিবেশন করা যায়।  

একজন আদর্শ সাংবাদিকের রাগ-অনুরাগ, বিরাগ বা আবেগ থাকতে নেই। এসব কিছুর উর্ধ্বে উঠে কাজ করতে হবে। তাই প্রকৃত সাংবাদিকের কোন বন্ধু থাকে না।  তথ্য প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতি ও উৎকর্ষের সুবাদে একুশ শতকে এসে দ্রুতই বদলে যাচ্ছে মানব সভ্যতার দৃশ্যপট। নতুন সহ¯্রাব্দের সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও প্রচলিত ধারণা ও কৌশলগুলোতে এসেছে নানা পরিবর্তন। বিগত শতকের সংবাদপত্রের কার্যক্রম ছিল কাগজ, কলম, নোটবুক আর ম্যানুয়াল ক্যামেরা নির্ভর। একুশ শতকে এসে তথ্য প্রযুক্তির সুবাদে ল্যাপটপ, কম্পিউটার, ডিজিটাল ক্যামেরা, এমনকি মোবাইল ফোন ও মাল্টিমিডিয়া নির্ভর যন্ত্র কৌশল এর মাধ্যমে মূহুর্তেই সংবাদগুলো পৌছে যাচ্ছে প্রতিটি হাতের তালুতে। গোপন তথ্য সংগ্রহ করে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সরবরাহ করা সাংবাদিকতার মূল কাজ। জ্ঞানের পরিধি বিস্তারে তথ্য প্রধান উপকরণ হিসাবে কাজ করছে। জীবন জীবিকায় প্রয়োজনে জ্ঞানের ক্রমবিকাশ ঘটছে। সুচারুরূপে সরকার পরিচালনা তথা সুশাসন প্রতিষ্ঠায় তথ্যের অবাধ আদান-প্রদান গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হিসাবে কাজ করছে। তথ্য প্রযুক্তির কল্যাণে সাম্প্রতিককালে এই তথ্য প্রবাহে নতুন গতি এসেছে সাংবাদিকদের মাধ্যমে।  

সাংবাদিক একজন চলমান সংবাদ, যিনি সংবাদপত্রের মুখচ্ছবি। তার বুদ্ধি-বিবেক, অগাধ জ্ঞান পান্ডিত্য থাকতে হবে। তাকে সর্বাগ্রে থাকতে হবে সৎ, থাকতে হবে অপরিসীম দেশপ্রেম।  

অগাধ জ্ঞান এবং পান্ডিত্য শব্দ দুটো সাংবাদিকতায় বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আসে না। তবে যিনি সাংবাদিকদের শিক্ষক হবেন তাকে এ সম্বন্ধীয় জ্ঞান থাকতে হবে। এখানে সাংবাদিকদের উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে এসে সাংবাদিকতায় যোগ দিতে হবে এমন বাধ্যবাধকতা নেই। সংবাদ তৈরি বা লেখনীতে থাকতে হবে খুব সহজ ভাষার প্রয়োগ। সংবাদটি এমনভাবে লিখতে হবে যা- নিরক্ষর ব্যক্তি থেকে সর্বোচ্চ শিক্ষিত ব্যক্তিটি পর্যন্ত খুব সরল ভাষায় বোঝে উঠতে সক্ষম হন। 

 “সাংবাদিকতা যেমন ঝুঁকিপূর্ণ পেশা, তেমনি দিগন্ত জয়ের দূরন্ত নেশার স্পর্ধিত তারুণ্যের দুঃসাহসী অভিযান সাংবাদিকতা”।

About Bappy Chowdhury

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *